বাংলা শব্দে শ্বাসাঘাত বা ঝোঁক, শ্বাসপর্ব ও আভ্যন্তর যতি, বাংলা ও ইংরেজি শ্বাসাঘাতের পার্থক্য ও বাক্যের সুর


শ্বাসাঘাত বা ঝোঁক:


এবারে ধ্বনির একটি বিশিষ্ট দিক আলোচনা করব আমরা। কথা বলতে গিয়ে আমরা একটা ধ্বনির প্রবাহ গড়ে তুলি, অবশ্য সে প্রবাহ হয়তো একটানা নয়, ক্ষণবিচ্ছিন্ন। কোনও কোনও ভাষায় এই উচ্চারিত শব্দধ্বনিতে স্বরের একটা বিশেষ ঝোঁক পড়ে, একে আমরা 'শ্বাসাঘাত' বা 'বল' বলি, ইংরেজিতে যেমন এই stress বা accent আছে, বাংলাতেও তেমনি আছে। তবে এই দুটি ভাষায় ঝোঁক বা accent-এর তফাত আছে। ইংরেজিতে সাধারণত সহায়ক ক্রিয়া is-am-are বা preposition ও conjunction ছাড়া একাক্ষর noun, adjective এবং মূল verb-এ accent পড়বেই, দ্বাক্ষর বা ত্রাক্ষর শব্দ হলে বিশেষ জায়গায় তার স্থান নির্দিষ্ট হয়ে আছে, বাক্যের যে কোনও জায়গায় তার অবস্থান হোক না কেন, accent ওই নির্দিষ্ট জায়গাতেই পড়বে। যেমন character, accomplish, account এই তিনটি শব্দের মধ্যে প্রথমটিতে প্রথম অক্ষরে, দ্বিতীয়টিতে দ্বিতীয় অক্ষরে এবং তৃতীয়টিতে দ্বিতীয় অক্ষরে accent পড়বে; বাক্যের মধ্যে যে কোনও জায়গায় এই শব্দগুলি থাকুক না কেন এদের accent-এর কোনও হেরফের হবে না। কিন্তু বাংলায় তা নয়।

শ্বাসপর্ব ও আভ্যন্তর যতি:


বাংলায় শব্দের শুধু প্রথম অক্ষরেই ঝোঁক পড়ে। যেমন কলকাতা, বাড়ি বাঙালি, সেদিন, যখন। কিন্তু এরা যখন বাক্যে বাঁধা পড়বে তখন এ-ঝোঁক তাদের বজায় না-ও থাকতে পারে। সেদিন যখন সে এসেছিল আমি বাড়ি ছিলাম না। এখানে সেদিনের 'সে'র উপরে ঝোঁক, আর 'আমি'র 'আ'র উপরে ঝোঁক। তা হলে নিয়মটা কী দাঁড়াল? নিয়মটা হল, একেকটা শ্বাসপর্বের প্রথমে যে অক্ষর শুধু তার ওপরই ঝোঁকটা পড়বে। অর্থের খাতিরে যতটুকু আমরা এক শ্বাসে উচ্চারণ করি তা-ই হল একেকটা শ্বাসপর্ব বা শুধু পর্ব। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের মধ্যে যে ক্ষণবিরতি তাকেই আমরা আভ্যন্তর যতি বা অন্তর্যতি বলি। এবারে আগের বাক্যটিকে ভাগ করে দেখানো যাক: সেদিন যখন সে এসেছিল * আমি বাড়ি ছিলাম না। * চিহ্নটি অন্তর্যতি। এখানে দুটি পর্বের প্রথমটির প্রথম অক্ষরে এবং দ্বিতীয়টির প্রথম অক্ষরে ঝোঁক বা আসাঘাত পড়েছে।

একটি বড় বাক্য নিই:

এখানে কেউ রেলিং বানিয়ে দেয় না, হরেকরকম সাইনবোর্ড দুদিকের পাহাড়ে সেঁটে দেয় না; বিশেষ সংকীর্ণ সংকট পেরবার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে দুদিকের মোট আটকানো হয়।

এই বাক্যটিকে পর্বে ভাগ করলে দাঁড়াবে এই রকম:

এখানে কেউ * রেলিং বানিয়ে দেয় না * হরেকরকম সাইনবোর্ড দুদিকের পাহাড়ে সেঁটে দেয় না * বিশেষ সংকীর্ণ সংকট পেরবার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে * দুদিকের মোট আটকানো হয়। এখানে ছোট বড় সাত-সাতটি পর্ব। এই পর্বগুলির প্রতিটির অক্ষরে ঝোঁক পড়েছে। পর্ববিভাগে মতান্তর ঘটতে পারে, কিন্তু যে-ভাবেই ভাগ করা হোক না কেন পর্বের প্রথম অক্ষরে জোর দেওয়া বাংলার স্বভাবধর্ম।

বাংলা ও ইংরেজি শ্বাসাঘাতের পার্থক্য:


বাংলায় শ্বাসাঘাত ও ইংরেজি accent-এর পার্থক্যটা সুনীতিকুমারের কথাতেই বলি: "বাংলায় বাক্যস্থ শ্বাসপর্ব বা অর্থপর্বগুলি যেন একান্নবর্তী পরিবার-মাথার উপর কর্তা, স্বরাঘাতরূপ মর্যাদা তাঁহারই, এবং পরে কতকগুলি অক্ষর বা পদ, স্বরাঘাত বিষয়ক নিজ নিজ বৈশিষ্ট্য বা স্বাধীনতা স্বেচ্ছায় বর্জন করিয়া থাকে। কিংবা যেন কতগুলি রেলগাড়ির সমষ্টি, স্বরাঘাতযুক্ত প্রথম অক্ষর যেন ইঞ্জিন গাড়ি, বাক্যখণ্ডের অন্য অক্ষরগুলিকে টানিয়া লইয়া চলিয়াছে, আর ইংরেজি বাক্য যেন সিপাহীদের কুচ করিয়া হাঁটিয়া যাওয়া, প্রত্যেক প্রধান শব্দের বল বা ঝরাবাত বন্দুকের উপরে সঙ্গীনের ন্যায় নিজ স্বাতন্ত্র্যে বিদ্যমান, কেও কারো স্বয়ীন নহে।" (ভাষাপ্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ)

সুনীতিবাবুর রূপক অনুসারে বলা যায়, আগে যে বাক্যটি উদ্ধৃত করেছি তার মধ্যে এ, রে, হ, দু, বি, স, দু. এ এই পর্বগুলির প্রথম অক্ষরগুলো 'যেন যৌথপরিবারের কর্তা বা স্বর-শকটের ইঞ্জিনগাডি।


সুর:


বাক্যে আর-এক ধরনের উচ্চারণ বৈশিষ্ট্য আছে, তা স্বরের উঁচুনিচু ভাবকে আশ্রয় করে প্রকাশিত। একেই আমরা বলি সুর, ইংরেজিতে একেই বলে pitch accent, musical accent বা intonation. ইংরেজি accent শব্দটির মধোও কিন্তু সুরের অর্থটি লুকোনো আছে। সংস্কৃতে এই সুরকে বলে কাকু-ভিন্নকণ্ঠধ্বনিধীরৈঃ কাকুরিতাভিধীয়তে। বৈদিক স্বরপ্রক্রিয়ায় উদাত্ত, অনুদাও ও স্বরিত এই তিনটি সুর উচ্চ-নীচ ভাবের প্রকাশক-ইংরেজি পরিভাষায় বোধ হয় অর্থ সুন্দর ভাবে প্রকাশ পায়-high pitch, low pitch আর combined rise and fall. সামবেদে ঋগুলি এই ত্রি-স্বর সন্নিবেশে গাওয়া হত। এই প্রক্রিয়ায় অর্থের যোগ এবং গীত-ধর্মের সম্পর্কটি বেশ জটিল। আমরা এই ত্রিস্বর থেকে শুধু এই তাৎপর্যই গ্রহণ করি যে স্বরের ওঠানামার ব্যাপারটি সুপ্রাচীন। আদিবাসীদের বাক্য উচ্চারণেও বিশেষ একটি সুর বা স্বর-ন্যাস আমরা লক্ষ করি। এই সুর-চয়নের ব্যাপারে একেকটি ভাষার সঙ্গে অন্য ভাষার গরমিল থাকতেই পারে, নানা কারণে। তবে একটা বিষয় বোধ হয় স্পষ্ট-আমাদের ভয়, রাগ, অভিমান ইত্যাদি আবেগ বা প্রশ্ন, বিস্ময়াদি থেকেই এই সুরের তারতম্য ঘটে।

ফুলটি সুন্দর-এই বাক্যে 'সুন্দর'-এর স্বরের যে আন্দোলন তা বেড়ে যায় 'কী সুন্দর ফুলটি' এই বাক্যে। আবার ফুলটি সুন্দর কি না জানতে চেয়ে কেউ যদি প্রশ্ন করে 'ফুলটি কি সুন্দর?' তা হলে 'সুন্দর'-এর সুরে পরিবর্তন আসে। শিশুরা ভাষা না জেনেও কোন বাক্যে তাকে আদর করা হচ্ছে আর কোন বাক্যে তাকে ধমকানো হচ্ছে তা বোঝে। ও ও ও-মিষ্টি সুরে বললে শিশুটি খুশিই হবে। অনুকরণে 'ও' বলতেও চেষ্টা করবে। কিন্তু ওই 'ও' যদি ধমকের সুরে উচ্চারিত হয় শিশুটি কেঁদে ফেলবে, অথবা ঠোঁট ফোলাবে। শব্দে জোর দেবার ব্যাপারেও সুরের পরিবর্তন হয়। 'দাদু কি খাবে?' দাদু খাবে কি না জিজ্ঞাসা করলে 'খাবে'র উপর জোর হবে, কিন্তু 'দাদু কী খাবে?' বললে অর্থাৎ 'কী'-এর ওপর জোর পড়লে অর্থও বদলে যাবে।

এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ কি ও কী দুটি বানান আলাদা ব্যবহার করতেন। আমরাও বানানে এই পার্থক্য বজায় রাখার পক্ষপাতী। বিশেষ জোর দেবার জন্যে অর্থাৎ অর্থগত প্রয়োজনে বিশেষ শব্দের ওপর গুরুত্ব দেবার একটি আশ্চর্য উদাহরণ দিই রবীন্দ্রনাথের 'গুরুবাক্য' থেকে। এখানে ঝোঁক আর সুর একসঙ্গে মিলেছে।

বদনের মনে একটা প্রশ্নের উদয় হয়েছে কাল মশারি ঝাড়তে ঝাড়তে-বিহগরাজ জটায়ু রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে কেন নিহত হলেন? এ ব্যাপারে বদনের সতীর্থ কার্তিক, খগেন্দ্র, অচ্যুত সবাই 'গুরুদেবের নিষ্পত্তি শুনতে উদ্‌গ্রীব। গুরুদেব বললেন, প্রথমে দেখতে হবে রাবণেরই সঙ্গে যুদ্ধ হয় কেন, তার পরে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধই বা হয় কেন, তারপরে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জটাউই বা মরে কেন, সব শেষে দেখতে হবে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে জটাউ মরেই বা কেন?

শিরোমণি মশাইয়ের এই বাক্যের পর, অন্য উদাহরণের বোধ হয় আর প্রয়োজন নেই।