মহাবিদ্রোহের কারণ ও প্রকৃতি আলোচনা করো। (জ্ঞানমূলক)

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের দ্বারা। কিন্তুইংরেজ বিতাড়নের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল তারও অনেক আগে, তথাকথিত অশিক্ষিত আদিবাসী, কৃষক ও অতিসাধারণ চাকুরিজীবী নীচুতলার সিপাহিদের দ্বারা।

ইংরেজ বিতাড়নের প্রচেষ্টায় সিপাহিদের আত্মত্যাগ খুবই প্রশংসনীয়। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় প্রভৃতি নানা কারণেই সিপাহিরা ইংরেজ বিরোধী মহাবিদ্রোহে শামিল হয়।

■ মহাবিদ্রোহের কারণ:

প্রথমত, সিপাহিদের লাঞ্ছনা: কোম্পানির শাসনের সুযোগে শ্বেতকায় ইংরেজরা ভারতীয়দের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। সাধারণ কারণে ঊর্ধ্বতন ইংরেজ সামরিক কর্মচারীরা অধস্তন ভারতীয় সিপাহিদের চরম লাঞ্ছিত করত।

দ্বিতীয়ত, শাসননীতি: ব্রিটিশ শাসন নীতির দ্বারা ভারতীয়দের সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছিল। তৃতীয়ত, কৃষক শোষণ: সরকারের বিভিন্ন ধরনের ভূমিরাজস্ব ব্যবস্থার আসল উদ্দেশ্য ছিল কৃষককে শোষণ করে জমি থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা।

চতুর্থত, দুর্বিষহ জীবন: আর্থিক দৈন্যদশা সাধারণ জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই দুর্ভিক্ষ হত, সরকার কোনো প্রতিকার করত না।

পঞ্চমত, অধীনতা নীতি: লর্ড ওয়েলেসলির রাজ্য দখলের নীতি দেশীয় রাজন্যবর্গের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। আবার লর্ড ডালহৌসির নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী নীতি রাজন্য ও প্রজাবর্গের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

ষষ্ঠত, রাজ্যগ্রাস: দেশীয় রাজ্যগুলি গ্রাস হওয়ার ফলে স্থানীয় মানুষও পরাধীনতায় আবদ্ধ হয়। তাদের আত্মসম্মান বিসর্জিত হয়। চাকরির সুযোগ বন্ধ হয়। দেশীয় রাজাদের নানাবিধ পৃষ্ঠপোষকতা হারায়। সপ্তমত, কারিগর শ্রেণির দুরবস্থা: দেশীয় শিল্পের অবক্ষয় কারিগর শ্রেণির ওপর চরম আঘাত হানে। বেকারির জ্বালায় তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অষ্টমত, চাকরির বৈষম্য: চাকরির ক্ষেত্রে শ্বেতকায় ও ভারতীয়দের মধ্যে বিরাট বৈষম্য করা হত। ভারতীয়রা পরিশ্রমের উপযুক্ত বেতন পেত না।

নবমত, খ্রিস্টধর্ম প্রচার: ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে আসে খ্রিস্টান মিশনারিরা, ধর্মান্তরকরণই ছিল যাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। হিন্দু-মুসলমান উভয়েই ধর্মনাশের আশঙ্কায় আতঙ্কিত থাকতেন। দশমত, সমুদ্রযাত্রা: এই সময় ব্রহ্মদেশে ভারতীয় সৈন্যদের সমুদ্রপথে পাঠানো হয়। ভারতীয় হিন্দু, মুসলমান উভয় সৈন্যের পক্ষেই কালাপানি পার হওয়া ছিল ধর্মবিরুদ্ধ।

একাদশত, মোগল শাসনের বিলোপ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা মোগল শাসনের বিলোপ ভারতীয় মুসলমানরা মেনে নিতে পারেনি। ইংরেজদের তারা প্রথম থেকেই শত্রু মনে করতেন। মানসিকভাবেই তারা ইংরেজদের বিরোধিতা করতে প্রস্তুত ছিল।

দ্বাদশত, ইংরেজদের জাত্যভিমান: ইংরেজরা সর্বদাই নিজেদের বর্ণগতভাবে শ্রেষ্ঠ মনে করত এবং ভারতীয়দের কালা আদমি বলে ঘৃণা করত। তারা কোনো সময়েই ভারতীয়দের সঙ্গে একাত্ম হতে চায়নি। ভারতীয়দের শোষণ করা ছাড়া তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতি ছিল না।

ত্রয়োদশত, সরকারের নানাবিধ সংস্কার: সরকারের নানাবিধ সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার রক্ষণশীল হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায় গ্রহণ করতে পারেনি। টেলিগ্রাফ, রেলপথের প্রচলনও তারা ভালো চোখে দেখেনি।

চতুর্দশত, স্বত্ববিলোপ নীতি: দেশীয় রাজন্যবর্গের পোষ্যপুত্রের স্বত্ববিলোপ নীতিও এই বিদ্রোহের অন্যতম কারণ।

পঞ্চদশত, এনফিল্ড রাইফেল: মহাবিদ্রোহের প্রাক্কালে সরকার সৈন্যবাহিনীতে এনফিল্ড রাইফেলবা বন্দুকের প্রচলন করে। এই রাইফেলের কার্তুজ দাঁতে কেটে রাইফেলে পুরতে হত। কার্তুজে ছিল পশুর চর্বি মেশানো। সিপাহিদের মধ্যে গুজব রটে যে, তা গোরু ও শূকরের চর্বি মেশানো এবং সরকার হিন্দু-মুসলমান উভয় সিপাহিদের ধর্মনাশের জন্যই এইরকম ব্যবস্থা করেছে। সিপাহিদের ধৈর্যচ্যুতি হল। সিপাহিদের মধ্যে এনফিল্ড রাইফেলের ব্যবহারই সিপাহি বিদ্রোহের প্রত্যক্ষ কারণ হয়ে দাঁড়াল। সিপাহিরা ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে (১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে) বিদ্রোহ ঘোষণা করল।

■ মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি:

মহাবিদ্রোহের (১৮৫৭ খ্রিঃ) প্রকৃতি সম্বন্ধে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের বিভিন্ন মত।

• নিছক সিপাহি বিদ্রোহ: মহাবিদ্রোহের প্রকৃতি বিশ্লেষণে অনেকে মনে করেন যে, এই বিদ্রোহ ছিল নিতান্তই ভারতীয় সিপাহিদের বিদ্রোহ। চাকরির ক্ষেত্রে অসন্তোষের জন্যই সিপাহিরা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বেশিরভাগ ইংরেজ ঐতিহাসিকই এই অভিমত পোষণ করেন। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, দুর্গাদাস ব্যানার্জি ও সুরেন্দ্রনাথ সেনও এই মত পোষণ করেন। এঁদের মতে এই বিদ্রোহে সিপাহিরাই একমাত্র সক্রিয় ছিল। স্যার সৈয়দ আহম্মদ খানের মতে, এই বিদ্রোহে 'দেশপ্রেম' বা জাতীয়তাবাদের কোনো স্থান ছিল না। তিনি মনে করেন, "They (the Sepoys) had defied the lawful British authority as a vast error of judgement in greed and out of their ancestoral pride."

• জাতীয় বিদ্রোহ: কার্ল মার্কসের মতে, এই মহাবিদ্রোহ ছিল প্রকৃতপক্ষে জাতীয় বিদ্রোহ। বীর বিনায়ক দামোদর সাভারকার তাঁর রচিত The Indian War of Independence of 1857 পুস্তকে এই অভ্যুত্থানকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে বর্ণনা করেছেন। অশোক মেহতা তাঁর 1857, The Great Rebellion' পুস্তিকায় সাভারকারের অভিমতকে সমর্থন করেছেন। Dr.S.N. Sen-এর মতে, মহাবিদ্রোহ ধর্মীয় যুদ্ধ হিসাবে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল ('What began as a fight for religion ended as a war of independence') |

• আংশিক সত্যতা: তবে মনে হয় উভয়মতের মধ্যেই আংশিক সত্যতা আছে। সিপাহি বিদ্রোহ সিপাহিদের ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত অসন্তোষ থেকে আরম্ভ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়। তাদের অসন্তোষ ছিল ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী নীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে।

• সীমাবদ্ধতা: অবশ্য এই বিদ্রোহ উত্তর ভারতের কিছু অংশেই সীমাবন্ধ ছিল। পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র বা দক্ষিণ ভারতে এই বিদ্রোহ বিস্তার লাভ করেনি। সামন্ত শ্রেণির লোকেরা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষার তাগিদে এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয়।

• মূল্যায়ন: মোটের ওপর এই বিদ্রোহের চরিত্র ছিল আংশিক সিপাহিদের বিদ্রোহ ও আংশিক গণজাগরণ। বিদ্রোহীদের মধ্যে যে মুক্তিচেতনা ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।