১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ব্যর্থতার কারণগুলি বর্ণনা করো। এর ফলাফল কী হয়েছিল? (জ্ঞানমূলক)

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের বিদ্রোহ কেন ব্যর্থ হয়েছিল? [মাঃ পঃ ১৯৮৭]

কারণ: ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ বিরাট রকমভাবে শুরু হলেও আশাতীত কম সময়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। অন্যান্য ব্যর্থ প্রয়াসের মতো এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার নানা কারণ ছিল:

প্রথমত, সংহতির অভাব: মহাবিদ্রোহ একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শুরু হয়নি। বিদ্রোহীদের মধ্যে সংহতি ও যোগাযোগের অভাব ছিল। কানপুর, মিরাট, লখনউ প্রভৃতি স্থানে বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থলগুলিতে যোগাযোগ ও সংহতির অভাব ছিল। ফলে একস্থানের বিদ্রোহীরা অন্যস্থানের বিদ্রোহীদের কর্মপদ্ধতি সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিল। এক স্থানে যখন বিদ্রোহ আরম্ভ হয়েছে, অন্যস্থানে তখন বিদ্রোহ শুরু হয়নি অথবা বিদ্রোহ অবদমিত হয়েছে। সংহতি ও যোগাযোগের অভাবই ছিল এই বিদ্রোহের ব্যর্থতার প্রধান কারণ।

দ্বিতীয়ত, নেতৃত্বের অভাব: যোগ্য নেতৃত্ব যে-কোনো বিদ্রোহ বা সংগ্রামকে সাফল্য লাভ করায়। এই বিদ্রোহে সর্বভারতীয় স্তরে কোনো নেতা ছিলেন না। নানা সাহেব, কুনওয়ার সিং, রানি লক্ষ্মীবাঈ সকলেই ব্যক্তিগত স্বার্থে এই বিদ্রোহে শামিল হন। সর্বভারতীয় স্তরে নেতৃত্ব দেবার যোগ্যতাও তাঁদের ছিল না। বিদ্রোহীদের অযোগ্যতা ও ভুলের পূর্ণ সুযোগ ইংরেজ সেনাপতি স্যার হেনরি লরেন্স গ্রহণ করেন। তাঁর মতে, সিপাহিদের মধ্যে যদি একজন সুযোগ্য নেতা থাকতেন, এবং তারা যদি ইংরেজদের আক্রমণ করার ভিন্ন পথ ধরত, তাহলে ইংরেজরা নিদরুণভাবে পর্যুদস্ত হত, কিন্তু তা হবার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ সিপাহিদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন সত্য, কিন্তু বৃদ্ধ সম্রাটের যে সময়ে অবসর যাপন করার কথা, সে সময়ে তাঁর কাছে সৈন্যবাহিনীকে পরিচালনা করা বা কর্মদক্ষতা আশা করা যায় না। এছাড়া মোগল পরিবার তাঁকে পূর্ণ সমর্থন জানায়নি। কাজেই যোগ্য নেতৃত্বের অভাবও এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হবার অন্যতম কারণ।

তৃতীয়ত, বিক্ষিপ্ততা: বিদ্রোহী সৈন্যবাহিনী বিক্ষিপ্তভাবে ইংরেজ সামরিক ছাউনি আক্রমণ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের পরিচালক না থাকায় তারা অনেক সময়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। স্থানীয় অঞ্চলে তারা লুঠতরাজ চালায়। পরিণামে বিদ্রোহ সহজেই অবদমিত হয়।

চতুর্থত, ইংরেজদের দক্ষতা: ইংরেজ সামরিক বাহিনীর দক্ষতা ছিল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। ইংরেজ আধুনিক যুদ্ধপদ্ধতি প্রয়োগ করলেও ভারতীয়দের যুদ্ধকৌশল অনেক পিছিয়ে ছিল। সাময়িক বিপর্যয়ের পর অল্পকালের মধ্যেই তারা বিভিন্ন বিদ্রোহের স্থান পুনরুদ্ধার করে।

পঞ্চমত, লুঠতরাজ: বিদ্রোহীদের লুঠতরাজ অনেক স্থানেই বিরুদ্ধ-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অনেকক্ষেত্রেই তারা স্থানীয় মানুষের সমর্থন হারায়।

ষষ্ঠত, ইংরেজদের উন্নত অস্ত্র: ইংরেজ সামরিক বাহিনীর উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের কাছে পরবর্তীকালে সিপাহিদের প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ভারতীয়দের পুরোনো যুদ্ধকৌশল ও পুরোনো ধরনের অস্ত্রশস্ত্র (ঢাল, তলোয়ার, গাদা বন্দুক) ইংরেজদের আধুনিক অস্ত্রের কাছে তুচ্ছ হয়ে দাঁড়ায়। 

সপ্তমত, সংবাদ প্রেরণ: ভারতে টেলিগ্রাফের প্রচলনে সরকার বিদ্রোহীদের গতিবিধি সম্বন্ধে দ্রুত খবর পাঠাতে পারত বা নিজেরা সতর্ক থাকতে পারত। রেলওয়ের প্রচলনে বিভিন্ন স্থানের মধ্যে সৈন্য চলাচলের খুবই সুবিধা হয়। মন্থরগতি বিদ্রোহী সৈন্যরা ইংরেজ সৈন্যের কাছে পরাজিত হতে থাকে। 

অষ্টমত, রাজন্যবর্গ: এই বিদ্রোহের সময়েও দেশীয় রাজন্যবর্গের একটা বড়ো অংশ সরকারকে সাহায্য করে। নিজাম ছিল একান্তই ইংরেজদের বশংবদ। সিন্ধিয়াও ইংরেজদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। 

নবমত, শিখ ও গোরখা বাহিনী: ইংরেজরা ভারতীয় সৈন্য দ্বারাই এই বিদ্রোহ ব্যর্থ করে। বিদ্রোহ যখন তুঙ্গে সেই সময়ে শিখ ও গোরখা বাহিনী ইংরেজদের আদেশ শিরোধার্য করে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

দশমত, নীতিহীনতা: বিদ্রোহীদের নৈতিক আদর্শও খুব উঁচু ছিল না। ফলে অল্পকালের মধ্যে তাদের উৎসাহে ভাটা পড়ে।

একাদশত, বিশ্বাসঘাতকতা: ভারতীয়দের যেমন দেশপ্রেমের অভাব নেই, তেমনি বিশ্বাসঘাতকেরও অভাব নেই। বিশ্বাসঘাতকদের জন্য বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। বিদ্রোহীদের শ্রেষ্ঠ ভারতীয় সেনানায়ক তাঁতিয়া তোপিকে ধরিয়ে দিয়েছিল বিশ্বাসঘাতকরাই।

দ্বাদশত, বিদ্রোহীদের শৃঙ্খলরা অভাব: যুদ্ধজয়ে সামরিক দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা। দুর্ভাগ্যক্রমে, ভারতীয় বিদ্রোহী বা সিপাহিদের মধ্যে এই শৃঙ্খলাবোধের একান্ত অভাব ছিল। নিয়মানুবর্তিতার অভাব তাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।

ত্রয়োদশত, ইংরেজদের কূটনীতি: সরকার কূটনীতির দ্বারা ভারতীয়দের ঐক্যে ফাটল ধরায়। খেতাব, পুরস্কার বা চাকরির লোভ দেখিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। লর্ড ক্যানিং এক সময়মন্তব্য করেন, "সিন্ধিয়া যদি বিদ্রোহীদের পক্ষে যোগ দেন, তবে কালই আমাকে পোটলাপুঁটলি বেঁধে এই দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।*

চতুর্দশত, রক্ষণশীলতা: ভারতীয় চিরাচরিত রক্ষণশীলতা বিদ্রোহের সাফল্যের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতিক্রিয়াশীল নীতি। শহরাঞ্চলের শিক্ষিতদের প্রতিক্রিয়া ছিল সিপাহিদের বিরুদ্ধে, সরকারের সমর্থনে।

পঞ্চদশত, ইংরেজদের নৃশংসতা: ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর নৃশংস প্রতিশোধ স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ করে।

ষোড়শত, ইংরেজদের ভাগ্য: স্যার হেনরি লরেন্সের মতে, সিপাহি বিদ্রোহে ইংরেজরা যেন আশ্চর্যজনকভাবে একের পর এক ঘটনায় রক্ষা পায়।

ফলাফল:

এই বিদ্রোহের ফলে ভারতে শাসননীতি ও রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তনের সূচনা হয়।

প্রথমত, ফলাফলের প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় যে, বিদ্রোহীদের পরাজয়ের পর বিরাট সংখ্যক সিপাহিদের প্রকাশ্য স্থানে ফাঁসি দেওয়া হয়। নানা সাহেব নেপালের জঙ্গলে পালিয়ে যান। ঝাঁসির রানি যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। তাঁতিয়া তোপির ফাঁসি হয়। মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।

দ্বিতীয়ত, মহাবিদ্রোহের ফলে ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান হয়। ইংল্যান্ডেশ্বরী মহারানি ভিক্টোরিয়া নিজ হাতে ভারতের শাসনভার গ্রহণ করেন। তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে লর্ড ক্যানিং ভারতের প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হলেন।

তৃতীয়ত, দেশীয় রাজ্যগুলিতে আর হস্তক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।

চতুর্থত, একই স্থানে না রেখে সৈন্যবাহিনীকে কিছুকাল পরে স্থানান্তরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হল।

পঞ্চমত, ঘোষণা করা হল যে, এখন থেকে ভারতবাসীর প্রতি সদয়, নিরপেক্ষ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হবে।