কাব্য নির্মাণ কৌশলের কয়টি ভাগ ও কী কী? এই ভাগগুলির বিস্তারিত পরিচয়


কাব্য নির্মাণ কৌশলের কয়টি ভাগ ও কী কী?

কাব্য নির্মাণ কৌশলের তিনটি ভাগ। এগুলি হল- 

১. বিভাব 
২. অনুভাব 
৩. সঞ্চারীভাব

কাব্যের রস নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা অপরিহার্য। তাই রস সম্পর্কে স্বাভাবিক ভাবেই এই ভাবগুলির পরিচয় দেওয়া হয়। 

আচার্য ভরত তার নাট্যশাস্ত্র গ্রন্থে বলেছেন - বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংযোগেই রস নিষ্পত্তি ঘটে। কবিরা কাব্যের যে মায়া জগৎ সৃষ্টি করে তার কৌশলটা হল এই বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাব। আলংকারিকরা বোঝাতে চেয়েছেন যে এই তিনটি ভাবই রসের নিষ্পত্তি ঘটায়। 

বিভাব:

লৌকিক জগতে যা রতি প্রভৃতিভাবের উদ্বোধক, কাব্যে বা নাটকে তাকেই বলে বিভাব। উদাহরণ হিসেবে কাব্য জিজ্ঞাসায় বলা হয়েছে লৌকিক জগতে সীতা ও তাঁর রূপ, গুন, রামের মনে রতি, হর্ষ প্রভৃতি ভাবের উদ্বোধনের কারণ। সেটাই যখন কাব্যে ও নাটকে পরিবেশিত হয় তাকেই বিভাব বলে। আরও পরিষ্কার করে বললে বলা যায় যে কোনো সুন্দর ফুল দেখলে আমাদের মনে আনন্দের সঞ্চার হয়, কারোর মৃত্যু দেখলে আমরা শোকার্ত হই। মনের এই ভাবগুলো সম্পূর্ণভাবেই বাইরের বস্তুর উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ বাহ্যিক কোনো কারণ সামাজিকের চিত্তে এই ভাবগুলির জন্ম দিয়েছে। তাই ওই কারণগুলো হল বিভাব। সাহিত্যের ক্ষেত্রে শোক, আনন্দ ইত্যাদির কারণ প্রকাশ পেলে তাকে বিভাব নামে চিহ্নিত করা হয়। 

বিভাব আবার দুই প্রকার - ১. আলম্বন বিভাব, ২. উদ্দীপন বিভাব

যে বস্তু বা বিষয়কে অবলম্বন করে রসের উৎপত্তি হয়, তাকে বলে আলম্বন বিভাব। অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ নাটকে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা উভয়ে উভয়ের আলম্বন বিভাব। অন্যদিকে রস সৃষ্টির ব্যাপারে পারিপার্শ্বিক যে অবস্থা সহায়তা করে তাকে বলে উদ্দীপন বিভাব। যেমন - 

"বাসন্তী রং বসনখানি নেশার মতো চক্ষে ধরে।"

এখানে বাসন্তী রং মনে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে বলে এটি হল উদ্দীপন বিভাব। অর্থাৎ রসকে যা উদ্দীপিত করে তাই হল উদ্দীপন বিভাব।

অনুভাব:

অনুভাব সম্পর্কে কাব্য জিজ্ঞাসা গ্রন্থে বলা হয়েছে যে - 

"মনে ভাব উদ্বুদ্ধ হলে যেসব স্বাভাবিক বিকার ও উপায়ে তা বাইরে প্রকাশ পায়, ভাবরূপ কারণের সেইসব লৌকিক কার্য কাব্য ও নাটকের অনুভাব।"

অর্থাৎ, আমাদের অন্তরে কোনো ভাবের উদয় হলে বাইরে তার প্রকাশ ঘটবেই। যেমন - শোকে আমাদের চোখে জল আসে। তাই বলা হয় মনে ভাবের উদয় হলে তার যে বহিঃপ্রকাশ, যদি তা সাহিত্যে প্রযুক্ত হয়, তাকেই বলে অনুভাব। অতুলচন্দ্র গুপ্ত দেখিয়েছেন - 

“দ্বিধায় জড়িত পদে, কম্প্রবক্ষে নম্র নেত্রপাতে
স্মিতহাস্যে নাহি চল সলজ্জিত বাসর শয্যাতে 
স্তব্ধ অর্দ্ধরাতে।"

এই কাব্যাংশটিতে যে মিলনমধুর লাজের ছবি ফুটে উঠেছে, তার উপাদান হল কয়েকটি অনুভাব। 

সঞ্চারীভাব:

কাব্য নির্মাণ কৌশলের শেষ ভাগটি হল সঞ্চারীভাব। মানুষের মনে অসংখ্য ভাব থাকে। বিশেষ বিশেষ সময়ে বিশেষ বিশেষ ভাব মনে জেগে ওঠে। আলংকারিকেরা এই অসংখ্য ভাবের মধ্য থেকে ন'টি ভাবকে স্থায়ী ভাবরূপে চিহ্নিত করেছেন। এগুলি ছাড়া অন্য যে ভাবগুলি রয়েছে, সেগুলি স্বাধীনভাবে কখনই আমাদের মনে জেগে ওঠে না। তারা মনের নেপথ্যে সঞ্চরণ করে বেড়ায়। কারণ ঘটলেই এই ভাবগুলো কোনো না কোনো স্থায়ী ভাবের আশ্রয়ে মনে ভেসে ওঠে। এজন্যই এগুলিকে অনেকে ব্যাভিচারী ভাবও বলে থাকেন। স্থায়ীভাবের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই ভাবগুলি কাব্য ও নাটকে বৈচিত্র্য নিয়ে আসে। 

উপসংহার:

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিভাব, অনুভাব, সঞ্চারীভাবের সংযোগে কীভাবে রস নিষ্পত্তি ঘটে। আলংকারিকরা তা সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। কাব্যপাঠকের মনে হয় কাব্যের ভাব পরের, কিন্তু তা সম্পূর্ণ পরেরও নয়, নিজের। আবার সম্পূর্ণ নিজেরও নয়, যে কারণের জন্য কাব্যের বিষয়ের প্রতি আসক্তি এবং নিরাসক্তি দুটোই জাগে। আর তারই ফলে পাঠকের মনে উদ্বোধিত স্থায়ীভাব আস্বাদনযোগ্য রস-পরিণতি লাভ করে।