মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্যের নামকরণের সার্থকতা বিচার

বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম সার্থক পত্রকাব্য হল বীরাঙ্গনা কাব্য। এগারোটি কাব্যিক পত্রে সমৃদ্ধ এই কাব্যের মূল বিষয় পৃথক পৃথক নায়িকার তাদের প্রিয় নায়কের কাছে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিশেষ কাজের জন্য অনুরোধ করে অথবা অভিমান প্রকাশ করে পত্র প্রেরণ। বীরাঙ্গনা শব্দের সাধারণ অর্থ হল বীর রমণী। ফলে ব্যাকরণগত দিক থেকে এবং ঐতিহাসিক দিক থেকে সমালোচকেরা এর নামকরণ বিষয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন তা খুবই সংগত।

মূল আলোচনা:

সাধারণভাবে বীর অর্থে আমরা যা বুঝি তা হল অসম সাহসী লড়াকু মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি, যিনি অনায়াসে যুদ্ধযাত্রা করতে পারেন। কিংবা সমকালীন কোনো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতে পারেন। কিন্তু মধুসূদনের বীরাঙ্গনা কাব্যে একমাত্র জনা কিংবা মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা ছাড়া আর কোনো নায়িকার মধ্যে সেই পরিমাণ বীরত্ব দেখা যায় না। তবুও অন্যান্য নায়িকাকেউ বীরাঙ্গনা বলা হল কেন, এই প্রশ্ন কিন্তু এসেই যায়। 

ওভিদ যেমন কাব্যের দিক থেকেও মধুসূদনকে প্রভাবিত করেছিলেন, ঠিক তেমনই নামকরণের বিষয়টিও তাকে প্রভাবিত করেছিল। বিশেষ করে heroin শব্দটি কবিকে, কবির ভাবনাকে আচ্ছন্ন করেছিল। নায়িকারা তাদের প্রেম, প্রত্যাখ্যান, অনুযোগ ইত্যাদি বিষয়ে পত্রের মাধ্যমে তাদের প্রেমিক বা স্বামীর কাছে প্রেরণ করেছেন। ফলত নায়িকারাই এখানে মূখ্য হয়ে উঠেছেন। তাই নামকরণ প্রসঙ্গে heroin শব্দের প্রতি মধুসূদনের আকর্ষণ থাকাটাই স্বাভাবিক। মধুসূদন জানতেন যে কাব্য সাহিত্য , গল্প নাটক বা কবিতার নামকরণ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আপাতগ্রাহ্য আঙ্গিককে ছেড়ে তার বিষয়, বক্তব্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কাব্যে যেমন গতানুগতিক ঐতিহ্যকে বাড়তি মাত্রা আরোপ করে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বময়ী করে তুললেন, কাব্যের নামকরণের ক্ষেত্রেও তেমনই নতুন চিন্তার আলোকসম্পাত ঘটালেন।

বীরাঙ্গনা শব্দের আরেকটি অর্থ হতে পারে বীরদের অঙ্গনা। অর্থাৎ যে সমস্ত অঙ্গনা বা নারীর নায়কেরা বীর তাদেরও বীরাঙ্গনা বলা যেতে পারে। লক্ষণীয় এই অঙ্গনাগণ তাদের যে প্রেমিক বা স্বামীকে পত্র লিখেছেন তারা প্রায় প্রত্যেকেই বীর এবং সেই বীরদের অঙ্গনাগণ কর্তৃক রচিত পত্রকাব্যের নাম বীরাঙ্গনা হতে বাধা থাকে না। সেদিক থেকেও নামকরণ সার্থক হয়েছে। 

শকুন্তলা বনবাসিনী লাজুক স্বভাবের মেয়ে। তবুও তিনি জানেন বিবাহ করার পর স্ত্রীকে ত্যাগ করে, তাকে ভুলে গিয়ে অন্যত্র ভোগ বিলাসিতার মধ্যে জীবন কাটানো অন্যায়। শকুন্তলা রাজা দুষ্মন্তকে তা প্রকারান্তরে মনে করিয়ে দিয়েছেন। তারা গুরুপত্নী হওয়া সত্ত্বেও সন্তানতুল্য সোমদেবকে প্রেম নিবেদন করেছেন। হৃদয়ের অপ্রতিরোধ্য প্রেমাবেগকে ব্যক্ত করার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। 

কেকয়ী আর জনা তাদের নিজ নিজ স্বামীর অনুচিত কাজের জন্য তীব্র সমালোচনা করে সেই কাজের প্রতিবাদস্বরূপ গৃহত্যাগ বা প্রাণ ত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দশরথ কেকয়ীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে রামকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করতে উদ্যোগী হওয়ায় কেকয়ী রাজা দশরথকে পরম অধর্মাচারী, নির্লজ্জ প্রভৃতি বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন। রাজা নীলধ্বজ নিজপুত্রের হত্যাকারী অর্জুনকে শাস্তি না দিয়ে তাকে নরনারায়ণজ্ঞানে পূজা করতে থাকায় জনা ক্ষুব্ধ হয়ে তার স্বামীর সমালোচনা করেছেন। এই দুই নারী ক্ষত্রিয় ধর্মে উজ্জীবিতা, সাহসী। তাদের লেখা পত্রে অবশ্যই বীরত্বের ভাব আছে। 

উপসংহার:

যাইহোক, কাব্যের বিষয়বস্তু সমকালীন প্রসঙ্গ ও শব্দগত ব্যুৎপত্তি আলোচনা করে একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে আক্ষরিক অর্থে বীরাঙ্গনার নায়িকারা বীরাঙ্গনা না হলেও তাদের আচরণে যে দুঃসাহসিক বলিষ্ঠতা এবং সত্যভাষীতার পরিচয় পাওয়া গেছে তাতে তাদের বীরাঙ্গনা না বলে উপায় নেই। আর তাদের কথা নিয়ে রচিত যে কাব্য, সেই কাব্যের নামকরণে অসঙ্গতি যে নেই, একথা বলা যেতেই পারে।


বীরাঙ্গনা কাব্য কত সালে প্রকাশিত হয়?

বীরাঙ্গনা কাব্য ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।

বীরাঙ্গনা কাব্যটি মধুসূদন দত্ত কাকে উৎসর্গ করেছিলেন?

মধুসূদন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বীরাঙ্গনা কাব্যটি উৎসর্গ করেছিলেন।