জল দূষণের কারণ, ফলাফল ও জল দূষণ রোধের উপায়



◼️জল দূষণের সংজ্ঞা:

জীবের জীবনধারণের জন্য জল একান্তভাবেই অপরিহার্য। সাধারণভাবে বিশুদ্ধ জলে জীবের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের পদার্থ যেমন লোহা, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, নাইট্রেট, সালফেট ক্লোরাইড নির্দিষ্ট মাত্রায় থাকে, যা জীবের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের পক্ষে সহায়ক। যখন বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক পরিবেশের প্রভাবে জলের গুণগতমানের অবনমন ঘটে যাতে জীবকূল অর্থাৎ উদ্ভিদ ও প্রাণীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তখন তাকে বলা হয় জল দূষণ।

• জল দূষণের কারণ : 


যে সমস্ত প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক কারণে জল দূষিত হয় সেগুলি হল—

(i) শিল্প কেন্দ্র থেকে সৃষ্ট কঠিন ও তরল বর্জ্য পদার্থ।

(ii) গৃহস্থালীর আবর্জনা থেকে জল দূষিত হয়।

(iii) শহরাঞ্চলের তরল ময়লা জল দূষণ ঘটায়।

(iv) কৃষিকাজে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থ জল দূষণে সাহায্য করে। 

(v) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্পকেন্দ্র থেকে নির্গত গরম জল নদীতে কিংবা জলাশয়ে ফেলা হয়। ফলস্বরূপ জল দূষিত হয়। 

(vi) দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডিটারজেন্ট থেকে জল দূষিত হয়।

(vii) অ্যাসিড বৃষ্টিপাত জল দূষণ ঘটাতে সাহায্য করে থাকে।


(viii) তৈলবাহী জাহাজ থেকে নির্গত তেল সমুদ্রজলকে দূষিত করে। 

(ix) পারমাণবিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ও পারমাণবিক বিস্ফোরণ জনিত কারণে সৃষ্ট ক্ষতিকারক পদার্থ শেষ পর্যন্ত নদীর জলে মিশে জল দূষণ ঘটাতে সাহায্য করে। 

(x) বিভিন্ন রোগজীবাণু যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া প্রভৃতির দ্বারা জল দূষিত হয়।

(xi) মহাজাগতিক বস্তু ও আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত পদার্থসমূহ জল দূষণ করে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতে প্রতিটি পরিবার থেকে সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫০ কিগ্রা বর্জ্যপদার্থ জলে ফেলা হয়। ভারতের ১ লক্ষাধিক জনসংখ্যা বিশিষ্ট প্রথম শ্রেণির শহর থেকে প্রত্যহ প্রায় ১২০০ কোটি লিটার জল বর্জিত হয়, যার ৮৮% জলে বা মৃত্তিকায় মিশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জল দূষণ ঘটায়।

• জল দূষণের প্রভাব :


(i) জল দূষণের কারণে মানবদেহে বিভিন্ন ধরনের অসুখের সৃষ্টি হয়। যেমন—টাইফয়েড, আন্ত্রিক, কলেরা, আমাশায়, বিভিন্ন চর্মরোগ, এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হয়।

(ii) দূষিত জলের প্রভাবে মৃত্তিকায় বসবাসকারী বিভিন্ন জীবাণু ব্যাকটেরিয়ার বিনাশ ঘটায় মৃত্তিকার উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়। ফলস্বরূপ কৃষিকার্যের ক্ষতি হয়, উৎপাদন হ্রাস পায়। 

(ii) ভৌমজল দূষিত হলে মৃত্তিকায় ক্ষারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

(iv) জল দুষিত হলে নদী, সমুদ্রে মাছের পরিমাণ কমে যায়। 

(v) জল দূষণের ফলে জলজ উদ্ভিদের বিনাশ ঘটে। 

(vi) সামুদ্রিক দূষণের ফলে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ হয়।

• জল দূষণ নিয়ন্ত্রণের উপায় : 


জল দূষণ বন্ধ করার কিংবা দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কতকগুলি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যথা- 

(i) কঠিন আবর্জনা নদী, হ্রদ, সমুদ্রে ফেলা বন্ধ করতে হবে।

(ii) তরল বর্জ্যপদার্থগুলি সরাসরি জলে না ফেলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিশ্রুত করার ব্যবস্থা করা। 

(iii) কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করা।

(iv) তৈলবাহী জাহাজগুলি থেকে যাতে সমুদ্রজলে তেল না মেশে তার ব্যবস্থা করা।

(v) ময়লা আবর্জনা দ্বারা জলাশয় কিংবা হ্রদের ভরাট বন্ধ করা।

(vi) জল দূষণ সম্পর্কে জনগণের চেতনা বৃদ্ধি করা।

(vii) সরকারি নীতি ও আইন সঠিকভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা প্রভৃতি।