মহাভারত রচনাকার কাশীরাম দাসের কৃতিত্ব বিচার | Mahabharata Composer Kasiram Das and His Achivements



বাংলা ভাষায় রচিত রচিত মহাভারতগুলির মধ্যে কাশীরাম দাসের মহাভারতই সম্পূর্ণতা এবং সার্থকতা লাভ করেছে। সাধারণভাবে কাশীরাম দাসী মহাভারত ব্যাস-মহাভারতের অনুসরণে রচিত হ'লেও এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্যও বড় কম নয়। উভয়ের পর্ব-সংখ্যা সমান হ'লেও পর্বের নাম পার্থক্য বর্তমান। কাশীরাম দাসে 'গদাপর্ব' যা ব্যাসভারতে নেই, আবার ব্যাসভারতের 'অনুশাসন পর্ব' কাশীরামে অনুপস্থিত। ব্যাস-ভারতের 'মহাপ্রস্থান' ও 'স্বর্গারোহণ পর্ব' একত্রে কাশীদাসী ভারতে স্বর্গারোহণ পর্ব রূপে রচিত হয়েছে। এ ছাড়া পর্বগুলির মধ্যেও কিছু ইতরবিশেষ হয়েছে।

কাহিনীর দিক থেকে বলা চলে, কাশীদাসী মহাভারত মোটামুটিভাবে ব্যাস-ভারতের অনুসরণ করলেও কোন কোন স্থলে গ্রহণ ও বর্জনের নীতি গ্রহণ করেছে। দৃষ্টান্ত-স্বরূপ উল্লেখ করা চলে যে কাশীদাসী মহাভারতে ব্যাস-ভারতের বিদুলার তেজস্বিতার কাহিনী, রুরু প্রমদ্বরার উপাখ্যান এবং উপরায়ণ ব্রাহ্মণের শত্রুযজ্ঞ' আদি কতগুলি মনোহর কাহিনী একেবারে বর্জিত হয়েছে। আবার এতে ‘শ্রীবৎস চিন্তার কাহিনী, অকালে আম্রোৎপত্তির বিবরণ, জনা-প্রবীরের কাহিনী, ভানুমতী ও লক্ষ্মণার স্বয়ংবর’-আদি কাহিনী নোতুনভাবে সংযুক্ত হয়েছে, ব্যাস- ভারতে এদের অস্তিত্ব নেই। ব্যাস ভারতের যে সকল অংশ তত্ত্বালোচনা-পূর্ণ, কাশীদাসী ভারতে সেগুলি পরিবর্জিত অথবা সংক্ষেপিত হয়েছে।

গীতা ব্যাস-ভারতের একটি অমূল্য সম্পদ, কিন্তু কাশীদাসী মহাভারতে নেহাৎ কাহিনীর সংযোগ রক্ষা করবার জন্য এর উল্লেখমাত্র করা হয়েছে। অনুগীতাও এতে বর্জিত হয়েছে ।
'রাজধর্মানুশাসন, আপদ্ধর্ম ও অনুশাসন-পর্ব বাঙলা মহাভারতে প্রায় অনুক্ত বললেই চলে। আবার কাশীদাস কখন কখন মূল কাহিনীরও রূপান্তর ঘটিয়েছেন। 'যক্ষ যুধিষ্ঠির সংবাদে' কাশীদাসী ভারতে মাত্র চারটি প্রশ্নের উল্লেখ আছে কিন্তু মূলে প্রশ্ন ছিল শতাধিক। কাশীদাসী ভারতে অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া যে সমস্ত দেশে গিয়েছিল, তার উল্লেখ ব্যাসের গ্রন্থে নেই। আবার ব্যাসের গ্রন্থে যে সকল দেশের কথা আছে, তা' বাঙলা মহাভারতে নেই। 

দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় যে ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণের লক্ষ্যভের চেষ্টা বর্ণিত হয়েছে, তা' ব্যাস-ভারতে নেই। কাশীদাসী মহাভারতে যে 'পারিজাতকা, রাজসূয় যজ্ঞে বিভীষণের অপমান কিংবা সত্যভামার ভুলারত-আদি কাহিনী' বর্ণিত হয়েছে, ব্যাস ভারতে এই সমস্ত কাহিনী অনুপস্থিত। বস্তুত, কাশীদাসী ভারত প্রধানত ভক্তিবাদের প্রবলতার মধ্যে নিপতিত হয়েছিল বলেই তার প্রভাবে বহু কাহিনী বর্জিত, গৃহীত পরিবর্তিত হয়েছিল। ইতঃপূর্বে বাঙলাদেশে চৈতন্যদেবের আবির্ভাব ঘটে গিয়েছে, ফলে প্রায় সমগ্র দেশই কৃষ্ণভক্তিতে মেতে উঠেছে। এহেন সময় কাশীরাম দাস, যিনি একজন বিশিষ্ট বৈষ্ণব ছিলেন এবং সম্ভবত সেই কারণেই নীলাচলধামে বাসের ব্যবস্থা করেছিলেন, তিনি যে আপন গ্রন্থকে সুবিধাজনকভাবে কৃষ্ণভক্তি-প্রকাশের অনুকূল করে গড়ে তুলবেন, তা' আর বিচিত্র কি? 

বাঙালীয়ানার ছাঁচে বাঙলা মহাভারত সৃষ্টি করে কাশীরাম দাস যে অসাধ্যসাধন করেছেন, তাই তাকে যুগযুগান্তরকাল বাঙালীমানসে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত রেখেছে, কাশীরাম দাসের এটিই শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্যে অসংখ্য কবি অনুবাদ-ক্রিয়ায় ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বিশেষ শক্তিমান, সেই সমস্ত কবির মনোভাবে একটা বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা কাহিনীর জন্য মূল সংস্কৃত গ্রন্থের দ্বারস্থ হ'য়েছিলেন ঠিকই কিন্তু অন্ধভাবে অপরের অনুকরণ করে যান নি। রামায়ণ অনুবাদের ক্ষেত্রে কৃত্তিবাস এবং ভাগবত অনুবাদ ক্ষেত্রে মালাধর বসু যে স্বাভগ্যের পরিচয় দিয়েছেন, মহাভারত অনুবাদের ক্ষেত্রে কাশীরাম দাসের কৃতিত্বও তারই অনুরূপ।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের কাহিনীকে একালের পটভূমিকায় পরিবেশন করতে গিয়ে কবি সমকালের দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করেছিলেন। তাই মূল মহাভারতের ক্ষাত্রবীর্য অনুরূপভাবে বাঙলা মহাভারতে ফুটে উঠবার অবকাশ পায়নি। অবশ্য এ কথা সত্য, কৃত্তিবাসী রামায়ণে বাঙালীয়ানা যতটা পরিস্ফুট, কাশীদাসী মহাভারতে তেমনভাবে বাঙালীয়ানা ফুটে ওঠা সম্ভব নয়। কারণ, রামায়ণ গার্হস্থ্য-জীবনের কাব্য, এতে পারিবারিক জীবনের সম্পর্ককে বাঙালীর ছাঁচে ঢেলে সাজা সম্ভবপর, কিন্তু সমগ্র দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন মহাভারতকে বাঙালী জীবনের আদলে গড়ে তোলা অসম্ভব ব্যাপার। তৎসত্ত্বেও কাশীরাম দাস মূল কাব্যের কাহিনী ও রসকে যতখানি সম্ভব অক্ষুণ্ণ রেখেও যতটা সম্ভব স্বতন্ত্র বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। এই কারণেই অসংখ্য মহাভারতের অনুবাদের মধ্যে কাশীরামের মহাভারতই বাঙালীর ঘরে সুদীর্ঘকাল এত সমাদরের সঙ্গে গৃহীত হ'য়ে আসছে। এ বিষয়ে ডঃ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, 

“কৃত্তিবাসী রামায়ণে বাঙালীর জীবন ও সমাজের এত বেশী ছাপ পড়েছে যে, রামকাহিনী বাঙালীর ঘরের সামগ্ৰী হ'য়ে গেছে। কাশীদাসী মহাভারতে ঠিক ততটা বাঙালীয়ানা দেখা যায় না। তবে কাশীরামের বিনয়াবনত বৈষ্ণব মনটি রচনার মধ্যে অকৃত্রিমভাবেই ধরা পড়েছে—ভক্তবংশে যে তাঁর জন্ম হয়েছিল, তা তাঁর রচনা থেকেই বুঝতে পারা যায়। এদিক থেকে উত্তর-চৈতন্য যুগের ভক্তির ধারা তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে প্লাবিত করেছিল।”